চতুর্থত্রিশ অধ্যায়
সময় দ্রুতই অর্ধমাস পার হয়ে গেল, কিন্তু আমার দাদা, জনাব জান চংকাং -এর কোনো খবরই আসেনি। অথচ আমি নিজে প্রতিদিনই সেই বুড়ো ভূতের নিত্যকার কিচিরমিচিরে প্রায় পাগল হয়ে উঠেছিলাম। সে বহু যুগ ধরে মৃত, গায়ে সর্বদা শীতল ছায়ার ছোঁয়া, একটু কাছাকাছি গেলেই আমার যেন বরফঘরে ঢুকে পড়েছি বলে মনে হয়। অথচ সে নিজেই টের পায় না, ভাবে আমার খুব আপন, কথাবার্তা বলতে বলতে কখন যে আমার পাশে এসে দাঁড়ায়, আমি তো সদ্য মাস ঘোরা শিশু, স্বাভাবিকভাবেই এতোটা সহ্য করতে পারি না।
আরেকটা কথা, যদিও বুড়োরা কাউকে খুঁজে পাচ্ছিল না, তবুও পূর্বপুরুষদের সমাধি আমাকে ঠিকঠাক করতে হবেই। কে জানে, কেউ কি বদলাবদলি করেছে নাকি, আগে থেকেই ব্যবস্থা না নিলে আমার মন শান্ত হবে না। সেই বুড়ো ভূত আবার সারাদিন আমার কানে কানে বলে, তার পা নাকি ফোসকা পড়ে গেছে। আমি মনে মনে হেসে বলি, মরার পর তোরা তিন হাত ওপরে ভেসে বেড়াস, পায়ে ফোসকা পড়বে কীভাবে? মিথ্যেও ঠিকমতো বলিস না!
পুরাকালের সমাধির ব্যাপারে লিউ পরিবার খুব যত্নশীল। আমি এক রাতে গম্ভীর মুখে লিউ পরিবারকে বললাম, ‘‘ঠাকুমা, গত রাতে আবার সেই নীল কাপড় পরা, বাঁ চোখের ভুরুর ওপর বড় তিলওয়ালা বৃদ্ধা এসেছিলেন।’’
শুনে ঠাকুমা কেঁপে উঠলেন, বারবার জিজ্ঞেস করলেন, বৃদ্ধা কী বললেন? দেখে বুঝলাম, নিশ্চয়ই এই প্রপিতামহী তাঁকে অনেক ভোগান্তি দিয়েছেন, নইলে বহু বছর আগেই তো মারা গেছেন, তবু নাম শুনলেই আজও কাঁপেন।
আমি অচঞ্চল মুখে বললাম, ‘‘তিনি কিছু বলেননি, শুধু আমার দিকে তাকিয়ে কাঁদছিলেন। আমি জিজ্ঞেস করলাম, কেন কাঁদছেন? তিনি বললেন, আবার বৃষ্টি হচ্ছে, তাঁর ঘরে জল ঢুকে পড়েছে, এখন আর বাস করার উপায় নেই, তাই তিনি বাড়িতে এসেছেন।’’
ঠাকুমার মুখ মুহূর্তে ফ্যাকাশে হয়ে গেল, অস্থির হয়ে উঠলেন, বললেন, ‘‘আমারই দোষ, আমি শুধু নিজের কথা ভেবেছি, পূর্বপুরুষদের কথা ভুলে গেছি। আমি এখনই লোক ডাকি, কালই সমাধি সারাই করাবো।’’ বলেই কাঁপতে কাঁপতে বেরিয়ে গেলেন, পথে যেতে যেতে লোক ডাকতে লাগলেন।
জান পরিবারের সমাধি লি হুয়া নদীর দক্ষিণ তীরে। আমি জান পরিবারের বড় ছেলে, তাই উপস্থিত থাকাটাই স্বাভাবিক। প্রথমে জান সাংয়ের নেতৃত্বে সবাই একে একে মাটিতে মাথা ঠেকিয়ে প্রণাম করল, প্রত্যেকটা প্রণামই সত্যিকার ছিল। মাথা ঠেকাতে ঠেকাতে কপালে রক্ত জমল, শেন শিয়াও হুয়া কষ্ট পেয়ে রুমাল বের করে মুছতে গেলেন, আমি বাধা দিলাম, এখনই মুছে ফেললে চলবে না, সবাই না দেখলে এই প্রণামের কোনো মানে নেই।
আজ সেই রহস্যময়ী বুড়িও এসেছেন, তিনি ফেং শুই বিশেষজ্ঞও বটে, তাই খুব ব্যস্ত। আমি আগেই সন্দেহের কথা তাঁকে জানিয়েছিলাম, তিনি বলেছিলেন, ভালোভাবে দেখবেন। তিনি সমাধির সামনে হাতজোড় করে ক্ষমা চেয়ে তারপর কাজ শুরু করলেন।
আমি ফিসফিস করে বললাম, ‘‘এখানে ফেং শুই পরীক্ষা করার কী দরকার?’’ জান সাং শুনে ফিরে এসে কড়া চোখে তাকাল, আমি হাসিমুখে তাকালাম, হ্যাঁ, এটাই তো বাবার মতো আচরণ।
রহস্যময়ী বুড়ি শেন শিয়াও হুয়ার হাত থেকে আমাকে নিয়ে নিচু গলায় বললেন, ‘‘চারপাশে কিছুই অস্বাভাবিক দেখছি না, তুমি ভুল শুনেছো না তো?’’
এখন আমার চোখ সাধারণ মানুষের মতোই, অতএব কিছুই দেখতে পাই না। যেহেতু যারা ক্ষতি করেছে তারা মাটির ওপর কিছু রাখেনি, নিশ্চয়ই মাটির নিচে কিছু করেছে। কিন্তু এই কথা আমি বলি কীভাবে? তাই ধাপ্পাবাজি করে বললাম, ‘‘পাহাড় দেখার আগে জল দেখা জরুরি; পাহাড় থাকলেও যদি জল না থাকে, তবে সে জমি খোঁজা বৃথা; জল না থাকলে বাতাস আসে, শক্তি ছড়িয়ে পড়ে; জল থাকলে শক্তি থামে, বাতাস থামে। জল আর বাতাসই ফেং শুইয়ের মূল। দেখুন, এখানে তিন হাত গভীর গর্ত, বৃষ্টি না থাকলে শুকনো, বৃষ্টি হলে জলাবদ্ধ, পশ্চিম-দক্ষিণ দিক থেকে কদাচিৎ বাতাস আসে, এমন জায়গা যতই সুন্দর বানান, মৃতদের জন্যই কেবল বাহার, বেঁচে থাকা পরিবারে উন্নতি আসে না। গর্ত খান, উঁচু করুন।’’
বুড়ি রেগে মাথায় চাপড় মারলেন, ‘‘তোমার কথা এমন খারাপ নয়! এখানে বাঘের আসন আছে, কয়েক দশকে বাঘের চেহারা হয়েছে, প্রাণশক্তি প্রবল, আমি একটু ব্যবস্থা করলেই ফেং শুইয়ের অসাধারণ স্থান হবে। তবু তুমিও খুশি না? কী, সম্রাট হতে চাও? এই কয়েকশো মাইল এলাকায় তো গড়া ড্রাগনের শিরা নেই তোমার জন্য।’’
তিনি এত প্রশংসা করাতে আমি ভালো করে তাকালাম, দেখলাম সত্যিই জায়গাটা খারাপ নয়, প্রাণশক্তি প্রবাহমান, সমাধির গাছগুলি যেন মহীরুহ, ছায়ায় ছেয়ে আছে। তাই তো বুড়ি বলতেন, জান পরিবারে আশি বছরের ঐশ্বর্য।
বুড়ি দেখলেন আমি খুঁটিয়ে দেখছি, বললেন, ‘‘তুমি অবশেষে বুঝলে?’’ আমি হ্যাঁ বলতেই হঠাৎ প্রশ্ন করলাম, ‘‘বুড়িমা, আপনি তো কম্পাস, ঘণ্টা, আটকোনা আয়না বা ফেং শুইয়ের তলোয়ার কিছুই আনেননি, তাহলে কীভাবে ফেং শুই নিয়ন্ত্রণ করছেন?’’
বুড়ি বললেন, ‘‘তুমি জানো কম না! এই সমাধিস্থল আমি-ই একসময় পছন্দ করেছিলাম। আজ তো শুধু মেরামত, এত কিছুর দরকার নেই।’’
আজ কয়েক ডজন কৃষক এসেছে সাহায্য করতে। আমি দেখলাম, তারা গাফিলতি করছে, ভয়ে প্রাণশক্তি নষ্ট হবে, তাই বুড়িকে বললাম কম্পাস বের করতে। চারপাশে ভালো করে দেখতে গিয়ে কোনো কারসাজির চিহ্ন পেলাম না, কৌতূহল আরও বাড়ল, কে এমন ফন্দি আঁটল, কিছুই বোঝা যাচ্ছে না, অথচ আমাদের ভাগ্য নিঃশব্দে কেড়ে নিচ্ছে।
বুড়ি নির্দেশ দিলেন, কবর খনন করতে। দেখা গেল বেশিরভাগ কফিন পচে গেছে, হিম শীতল বাতাসে ভূতের কান্নার আওয়াজ, রোদে কুচকুচে ধোঁয়া উঠে চারদিক ঢেকে দিল, চারপাশে শুধুই নীলাভ শিখা, বিষাদের ছায়া। আমি আর বুড়ি একে অপরের দিকে তাকালাম, নিশ্চয়ই কিছু অস্বাভাবিক ঘটছে। তাই খনন চলতে থাকল।
অনেকক্ষণ পরে কালো ধোঁয়া সরে গেল। কৃষকরা ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে আরও কয়েকটি সমাধি খুঁড়ল, তখনকার দিনে কফিন ছিল না, ঘাসের চাটাইয়ে মোড়া, দেখে মন ভারাক্রান্ত হয়ে উঠল। পূর্বপুরুষেরা কত কষ্টে বেঁচেছিলেন!
বুড়ি আর আমি চারদিকে ঘুরে ঘুরে খুঁটিয়ে দেখলাম, কোনো সূত্র পেলাম না। কিছুই না পেয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়লাম, আজ যদি কারণ না মেলে, তাহলে এভাবে মৃতদেহ মাটিতে ফেলা যায় না, কী, পূর্বপুরুষরা কি খোলা আকাশের নিচে পড়ে থাকবে?
চোখের জোর দিয়ে অবশেষে মাটির গভীরে অদ্ভুত এক রেখা দেখলাম, ভালো করে স্থান চিহ্নিত করে বুড়িকে মাঝখানে দাঁড়াতে বললাম। সঙ্গে সঙ্গে অনুভব করলাম, মাটির নিচ থেকে হালকা বাতাস বয়ে আসছে। একে অপরের দিকে তাকিয়ে আনন্দে বললাম, ‘‘এই তো জায়গা।’’
বুড়ি বললেন, ‘‘অদ্ভুত! কে যে এমন ফন্দি করল! তুমি না বললে আমার তো জানাই হতো না, ভাগ্য এমনভাবে অপচয় হয়! বুঝলাম, বাঘের আসন তৈরি হয়েছে, কিন্তু এত বছরেও ভাগ্য প্রকাশ পেল না, আসলে কেউ মাটির প্রাণশক্তি বের করে দিয়েছে।’’
‘‘বুড়িমা, বলুন তো, এমন ব্যবস্থা দীর্ঘদিন লুকিয়ে রাখার উপায় কী?’’
‘‘আমার বোধগম্য নয়, এমন নমনীয় উপায় কী হতে পারে? ভাবো তো, একবারে যদি শক্তি তুলে নেয়, তাহলে চারপাশের মাটি ধসে যাবে, কিন্তু এখানে...’’ বুড়ি বহু ঝড়ঝাপটা দেখলেও, সবই তো জানা সম্ভব নয়।
‘‘বুড়িমা, অযথা চিন্তা করবেন না, ওরা আরও খুঁড়ুক।’’
খুড়তে খুড়তে বিশ মিটার গভীর হল, অন্য কোথাও হলে জলে পৌঁছাত, কিন্তু এখানে এখনও শুকনো, মাটির ধুলো উড়ছে। বুড়ি চোখ কুঁচকে পুরোনো কলকে বের করলেন, ধোঁয়া টানতে টানতে দম ছাড়লেন।
গর্ত আরও গভীর হল, আরও কয়েক হাত খনন, হঠাৎ এক কৃষকের কোদাল শক্ত কিছুর গায়ে ঠেকল। বুড়ি সঙ্গে সঙ্গে থামতে বললেন, নিজেই গর্তে নেমে এলেন, কলকে দিয়ে মাটি ঠুকতে লাগলেন, কৃষকদের ওপরে উঠে যেতে বললেন, কিন্তু অনেক্ষণ তাদের দেখা গেল না।
উদ্বিগ্ন হয়ে দেখলাম, কৃষকরা পূর্বপুরুষদের হাড়গোড় গুছাচ্ছে। দেখে মনে হল, কোনো সমস্যা আছে—সব হাড় চাপা, কালচে, নিশ্চয়ই কিছু লেগেছে। তাই কৃষকদের বললাম, জল আনতে। এবার না ধুয়ে দিলে কে জানে কী বিপদ হবে!
রোদ প্রখর হলেও কবরের ভেতরে হিমেল বাতাস, চারদিকে অস্পষ্ট ছায়া ঘুরছে, বুঝলাম, সব পুরাতন ভূতেরা। এমন রোদের দিনে তারাও এখানে আসে!
জল এলো, কৃষকরা হাড় ধোয়ার জন্য এগিয়ে আসতে চাইল, বুড়ি কঠোর স্বরে বললেন, ‘‘নিজেদের পূর্বপুরুষের হাড়, নিজেদেরই ধুতে হয়, তবেই কাজ হবে।’’
বলেই তিনি সবার সামনে ভূতের মতো হাজির হলেন। দুই হাতে মুদ্রা ধরলেন, হাওয়ায় কম্পন, হাতে গোলাকার কিছু দৃশ্যমান হলো, কিছু মন্ত্র পড়ে আঙুল দিয়ে জলের দিকে ইশারা করলেন, সেই বস্তুটি সাঁ করে জলে পড়ে গেল, নিমেষে অদৃশ্য।
আমি কৃতজ্ঞ হয়ে বললাম, ‘‘বুড়িমা, অনেক কষ্ট দিলাম আপনাকে!’’ হ্যাঁ, আমি বুঝতে পারলাম, ঐ বস্তুটি আসলে তাঁর আত্মশক্তির একটি অংশ।